দশটি বড় প্রকল্পের জন্য আসছে আলাদা বাজেট

0
461

অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ও দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়নের জন্য ১০ বড় প্রকল্পের জন্য আলাদা বাজেট আসছে। আগামী ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১৮ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে ব্যয় হবে পৌনে তিন লাখ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আটটিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে গতি সঞ্চালক প্রকল্প বলে উল্লেখ করেছিলেন। নতুন দুটিসহ আগামী বাজেটে ১০ প্রকল্পকে আলাদা করে দেখাবেন অর্থমন্ত্রী। এ জন্য আলাদা একটি পুস্তিকাও তৈরি করবেন তিনি। পুস্তিকার নাম হবে কাঠামো রূপান্তরে বৃহৎ প্রকল্প: প্রবৃদ্ধি সঞ্চারে নতুন মাত্রা। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়িতব্য বা ফাস্ট ট্র্যাক নামে এই প্রকল্পগুলো বর্তমানেও আছে। আগামী বাজেটে নতুন যুক্ত হচ্ছে ‘পদ্মা রেলসেতু সংযোগ’ এবং ‘কক্সবাজার-দোহাজারী-গুনদুম রেলপথ’ নামে আরও দুটি। সব মিলিয়ে আছে তিনটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, তিনটি রেলপথ, দুটি গভীর সমুদ্রবন্দর, একটি সেতু ও একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প। এগুলো বাস্তবায়িত হলে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ বাড়বে বলে সরকার অনুমান করছে।

probable-budget-2016অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, এগুলো বাস্তবায়নে পৌনে তিন লাখ কোটি টাকার মতো ব্যয় হবে এবং একটি ছাড়া বাকিগুলো আগামী ৩ থেকে ১০ বছরের মধ্যে বাস্তবায়িত হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় গত এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পগুলোর সর্বশেষ অবস্থা বিশ্লেষণ করেছে এবং এগুলোর জন্য আগামী অর্থবছরে বরাদ্দের অঙ্কও ঠিক করেছে।
জানতে চাইলে সাবেক যোগাযোগসচিব ও অবকাঠামো খাত বিশেষজ্ঞ এম ফাওজুল কবির খান প্রথম আলোকে বলেন, বৃহৎ প্রকল্পগুলো হচ্ছে সরকারের একটি ইচ্ছে-তালিকা। সরকার কয়টা বাস্তবায়ন করতে চায় আর কয়টা বাস্তবায়নের সক্ষমতা সরকারের আছে, এটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে পদ্মা সেতু, এলএনজি টার্মিনাল, মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

পদ্মা বহুমুখী সেতু: কয়েক দফা বৃদ্ধির পর এ প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা, শেষ হবে ২০১৮ সালে। গত এপ্রিল পর্যন্ত এর ৩০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। জাজিরা সংযোগ সড়ক ও মাওয়া সংযোগ সড়কের কাজও শেষের পথে। ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন কার্যক্রম ও পরিবেশ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আগামী অর্থবছরে এর জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৬ হাজার ২৬ কোটি টাকা।

এম ফাওজুল কবির খান মনে করেন, যেহেতু একটা ঝামেলা হয়েছিল, তাই বিশ্বব্যাংককে দেখানোর জন্য হলেও প্রকল্পটি সরকার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: পাবনার ঈশ্বরদীতে ৫ হাজার ৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে সরকার ১ হাজার ৮৭ কোটি টাকা ব্যয় করবে। এর বাইরে রাশিয়ার প্রকল্প সাহায্য রয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা। ২০১৭ সালে এটি শেষ হওয়ার কথা। আগামী অর্থবছরে এ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৬১৮ কোটি টাকা।

মেট্রোরেল: ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকার এ প্রকল্পে সরকার ৫ হাজার ৩৯০ কোটি ও জাপান দিচ্ছে ১৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে এটি শেষ হওয়ার কথা। আগামী বাজেটে এর জন্য থাকছে ২ হাজার ২২৭ কোটি টাকা।

সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর: কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রকল্প এটি। ৫০ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্প তিন ধাপে বাস্তবায়নের সময়কাল ২০১৫ থেকে ২০৫০ সাল। প্রথম ধাপে একটি, দ্বিতীয় ধাপে দুটি ও তৃতীয় ধাপে তিনটি পোতাশ্রয় করা হবে। এর জন্য বাজেটে কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই।
জানা গেছে, এটি করার ব্যাপারে সরকার দ্বিধাগ্রস্ত। তবে নৌসচিব অশোক মাধব রায় গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পটি এখনো সমীক্ষা পর্যায়ে রয়েছে।

পায়রা বন্দর: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার রাবনাবাদ চ্যানেলে পায়রা বন্দর নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ, সংযোগ সড়ক নির্মাণ, ড্রেজিং কার্যক্রমে যন্ত্রপাতি কেনা নিয়ে যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করা হয়েছে, তাতে আগামী বাজেটে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।

মৈত্রী সুপার থার্মাল বিদ্যুৎকেন্দ্র: সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে বাগেরহাটের রামপালে নির্মাণের জন্য এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ২০১৯ সালে। এর মাধ্যমে ৬৬০ মেগাওয়াট করে দুটি আলাদা বিদ্যুৎকেন্দ্রে মোট ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। চলতি অর্থবছরে ২৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও আগামী অর্থবছরে রাখা হচ্ছে ২ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা।
মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র: কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী ও ধলঘাটা ইউনিয়নে ৬০০ করে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে মোট ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে। প্রকল্প ব্যয় ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা, যার বেশির ভাগই দেবে জাপান। এটি শেষ হওয়ার কথা ২০২৩ সালে। এর ভূমি অধিগ্রহণ শেষ হয়েছে। আগামী অর্থবছরে এ প্রকল্পের জন্য ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।

এলএনজি টার্মিনাল: গ্যাসের সংকট নিরসনে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির উদ্দেশ্যে মহেশখালীর উপকূলে দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের ক্ষমতাসম্পন্ন একটি টার্মিনাল হবে। টার্মিনাল থেকে মূল ভূখণ্ডে গ্যাস আনতে চট্টগ্রামের আনোয়ারা পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে ৯১ কিলোমিটার পাইপলাইন। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত পরামর্শক কমিটির বৈঠকে অর্থমন্ত্রী জানতে চাইলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরী প্রতিশ্রুতি দেন যে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে টার্মিনালটি হবে। তবে আগামী বাজেটে এর জন্য বরাদ্দ থাকলেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

কক্সবাজার-দোহাজারি-গুনদুম রেলপথ: ২০২২ সালের জুনের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। নতুন সময় তিন বছর এগিয়ে আনা হয়েছে। প্রকল্প ব্যয় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকার মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) দেবে ১৩ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে এর জন্য বরাদ্দ থাকছে ৬৩১ কোটি টাকা। দুই ধাপে ১২৯ দশমিক ৫৮৩ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হবে।

পদ্মা রেলসেতু সংযোগ: ৩৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্প ২০২২ সালে শেষ করতে চায় সরকার। এর মধ্যে ২৪ হাজার ৭৪৯ কোটি টাকা ২ শতাংশ সুদে ২০ বছর মেয়াদে চীন থেকে ঋণ নেওয়া হবে। ১৭২ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণের এই প্রকল্প হলে ঢাকা-খুলনা পথে ২১২, ঢাকা-যশোর পথে ১৮৪ এবং ঢাকা-দর্শনা পথের ৪৪ কিলোমিটার দূরত্ব কমবে। এই প্রকল্পের জন্য আগামী বাজেটে ৪ হাজার ১০২ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে।

NO COMMENTS