সস্তা জ্বালানি তেল টান দিয়েছে প্রবাসী আয়ে

0
380

দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি তেলের দাম সস্তা। এ জন্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলনির্ভর দেশগুলোর সবকিছু থেকেই অর্থ উধাও হয়ে যাচ্ছে। চাকরি হারাচ্ছেন প্রবাসী শ্রমিকেরা। এ জন্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ এশিয়ার কিছু দেশের প্রবাসী আয় কমে গেছে।

ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, পাকিস্তানের পাশাপাশি বাংলাদেশেও মধ্যপ্রাচ্যের সেই ঢেউ লেগেছে। এই অঞ্চলটি থেকেই বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় আসে। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৯০৭ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স আসে বাংলাদেশে। তবে বিদায়ী ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এসব দেশ থেকে ৫২ কোটি ডলারের কম বা ৮৫৫ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। অন্যদিকে সামগ্রিকভাবে প্রবাসী আয় আসার পরিমাণ গত অর্থবছর ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে গেছে। গত ২০১৫–১৬ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৯৩ কোটি ডলারের সমপরিমাণ প্রবাসী আয় এসেছিল। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রবাসী আয় এসেছিল ১ হাজার ৫৩১ কোটি ডলার।

গত রোববার দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ মার্কিন ডলারের বেশি ছিল। চলতি বছরের শুরুতে সেটি ৩০ ডলারের নিচে নেমে যায়। বর্তমানে সেটি কিছুটা বাড়লেও প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৪১ ডলারে আছে। তবে অপরিশোধিত তেলের দাম শিগগিরই বৃদ্ধি বা আগের মতো উচ্চ দামে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা কম।

তেলের কম দামের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সরকার তাদের অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য হচ্ছে। তেল বিক্রির মুনাফা দিয়ে তারা নির্মাণ প্রকল্প, নিজেদের লোকজনদের ভর্তুকির পাস ও বিদেশি শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানোর হার বাড়াত। তবে অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এই মডেল আর দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না।

এদিকে তেলের কম দামের চাপে পড়ে চাকরি হারানো হাজার খানেক ভারতীয় নাগরিক গত শনিবার সৌদি আরবে বিক্ষোভ করেন। অবস্থা এমন হয়েছে যে বিক্ষোভকারীদের ক্ষুধা নিবারণে ভারত সরকারকে উদ্যোগ নিতে হয়েছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শ্রীলঙ্কার প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ কমে যাওয়ায় দেশটির সরকারকে চলতি বছরের শুরুতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ১৫০ কোটি ডলার জরুরি ঋণ নিতে হয়েছে।

graphএ ছাড়া গত বছরের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর নেপালের যে সংস্কারকাজ চলছে, সেটি কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়েছে দেশটির সরকার। কারণ নেপালের প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ কমে গেছে। দেশটির বার্ষিক মোট জাতীয় উৎপাদনের ২৮ শতাংশই পূরণ হয় প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের মাধ্যমে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইনের কর্তৃপক্ষ বলেছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রবাসী আয় আসা ৬ শতাংশ কমেছে। শ্রীলঙ্কা, ভারত ও নেপাল বলেছে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রবাসী আয় আসার পরিমাণ ২০১৫ সাল কিংবা চলতি বছরের সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কমেছে। তবে ফিলিপাইনের মতো কিছু দেশ উপসাগরীয় অঞ্চল বাইরের দেশগুলো থেকে ভালো প্রবাসী আয় এনেছে। যেটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো করতে পারেনি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী অর্থনীতির দেশের কারণে উন্নয়নশীল দেশের প্রবাসীরা সেখান থেকে রেমিট্যান্স বেশি পাঠাচ্ছেন। বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদেরা প্রত্যাশা করছেন, বৈশ্বিক অবস্থার উন্নতি হবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চলতি বছর আরও বিস্তৃত হবে। তবে বিদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্ভরতা কমানো ও সংস্কার কার্যক্রম চালানোর পরও উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনীতি হয়তো আগের অবস্থায় ফিরবে না।
সৌদি আরবের বড় একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান সৌদি বিনলাদেন ৫০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করেছে। এর মধ্যে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যাই বেশি, যারা কিনা দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানিতে কাজ করে আসছিল। প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বিষয়টি নিশ্চিত করলেও কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
ভারতের কেরালা রাজ্যের নিয়াস সৌদি আরবে তিন বছর কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন। তবে বিদেশি শ্রমিকদের বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করায় গত ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন তিনি। নিয়াস সৌদি আরবে মাসে ৫৪০ মার্কিন ডলার আয় করতেন। এখন তাঁর আয় মাত্র ১৮০ ডলার।
৩১ বছর বয়সী নিয়াস বলেন, স্বপ্ন ছিল একটি গাড়ি কিনবেন তিনি। তবে তিনি এখন একটি ভাঙাচোরা স্কুটার চালান এবং তাঁর তিন বছরের ছেলে স্কুলে পাঠাতে পারবেন কি না সেটি নিয়ে সংশয়ে আছেন। তিনি আরও বলেন, ভালো দিন চলে গেছে।

NO COMMENTS